ঢাকা, সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৯ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

রাবিতে কমেছে বাসের ট্রিপ, ভিড়ের সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা


শিহাবুল ইসলাম, রাবি

প্রকাশিত: ১১:১৭ পিএম, ১৯ জুলাই ২০১৭, বুধবার | আপডেট: ১১:১৯ পিএম, ১৯ জুলাই ২০১৭, বুধবার
রাবিতে কমেছে বাসের ট্রিপ, ভিড়ের সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা

মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটা। ক্লাস শেষে সাহেববাজারে মেসে ফেরার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসস্ট্যান্ডে আসে সুমন হোসেন। বাসে জায়গা না থাকলেও বাসের গেটে ভিড়ের মধ্যে একটু দাঁড়ানোর জায়গা করে নেয় সে। তার মতো বাসের গেটে দাঁড়িয়ে ঝুলতে থাকে ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী।

ওভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় বাস চলতে শুরু করলে সুবর্ণজয়ন্তী টাওয়ারের পাশে গিয়ে বাস থেকে রাস্তায় ছিঁটকে পড়ে সুমন। বাসের গতি খুব জোরে না থাকায় পেছনের বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায় সে। তবে তার হাত-পা কেটে রক্তাক্ত হয়।

প্রায়ই এমন ছোটখাট দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যাতায়াত করা শিক্ষার্থীদের। বাসের তুলনায় শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীদের চলাচল করতে হয়। প্রতিবছর শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও অপরিবর্তিত থাকছে বাসের সংখ্যা।

কিন্তু এরপর আবার বিশ্ববিদ্যালয় সময়সূচি পরিবর্তনের সঙ্গে বাস চলাচলের সংখ্যাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। পূর্বে যেখানে ৮ ট্রিপে বাস চলাচল করতো সেখানে এখন পাঁচ ট্রিপে বাস চলাচল করছে।

ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, সাহেববাজারের দো’তলা ট্রিপের বাসটিতে জায়গা না পেয়ে সুমনসহ অনেক শিক্ষার্থীই দরজার কাছে ঝুলছিল। বাসটি সুবর্ণজয়ন্তী টাওয়ারের পাশে পৌঁছালে ভিড়ের মধ্যে সুমন ছিঁটকে রাস্তায় পড়ে যায়। পেছনের বাসের চালক সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক করায় চাকায় পিষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পান তিনি।  বাসগুলো ধীরগতিতে থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এগুলো দেখে না বলে অভিযোগ করেন তারা।

তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাস কম থাকায় খুব গাদাগাদি করে আমাদের চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে বাজারের ওই দো’তলা বাসটিতে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করতে হয়। তার ওপর পূর্বে যেখানে দুপুর ১২টা, ১টা ও ২টায় অর্থাৎ তিন বারে শিক্ষার্থীরা বাড়ি বা মেসে ফিরতো, সেখানে এখন দুপুরে একটা ও বিকেল ৫টায় ফিরতে হচ্ছে। বাসের ট্রিপ কমে যাওয়ার কারণে পাঁচটার বাসে ভিড় বহুগুণে বেড়ে গেছে। অবিলম্বে বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চলাচলের সুযোগ করে দেয়ার দাবি জানান তারা।

এ দিকে, ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের বাসগুলোতেও রীতিমত যুদ্ধ বেঁধে যায় আসনে বসা নিয়ে। দেখা যায় বাস ছাড়ার আধাঘণ্টা আগে থেকেই আসনে বসে থাকেন ছাত্রীরা। এমনকি ব্যাগ, ভিজিটিং কার্ড রেখে আসন দখলের প্রতিযোগিতা চলে তাদের। তারপরও অনেকে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে চলাচল করে। এখন বাসের ট্রিপ কমে যাওয়ায় বিকেলের বাসেও ভিড় বেড়ে গেছে। এমনই অভিজ্ঞতার কথা বলেন মৌমিতা চৌধুরী।

আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, আমরা প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে থাকি। এরপরও কেন তাহলে আমাদের যাতাযাতের সময় পরিবহন সংকটে ভুগতে হবে? প্রতিদিনই বাসে বাদুড়ের মতো ঝুঁলে যেতে হয়। ফলে যেকোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতর জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৩৮টি বাসের মধ্যে ৫টি অকেজো হয়ে আছে। ক্যাম্পাস থেকে বিভিন্ন রুটে এখন ২৭টি বাস চলাচল করছে। বাকিগুলো বেশ পুরনো হওয়ার কারণে চলাচলের উপযোগী নয়।

বাসের ট্রিপ কমানোর বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বাইরে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করেই তারা চলাচল করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সীমা বাড়ার সঙ্গে বাসের ট্রিপও বাড়ানোর কথা। কিন্তু পরিবর্তে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক। এখন শিক্ষার্থীদের ভাড়া দিয়ে অটোতে চলাচলে ব্যয় ও কষ্ট বাড়বে।’ এ নিয়ম প্রত্যাহার করে দ্রুত আগের থেকে বাসের ট্রিপ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

সময়সীমা বাড়ার সঙ্গে বাসের ট্রিপ বাড়ানোর দরকার বলে মনে করেন ছাত্রলীগের রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু। তিনি অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সর্বদা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে আছে ও থাকবে। ক্যাম্পাসের সময়সীমা বাড়ার সঙ্গে বাসের ট্রিপ কমানো কখনোই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে আমরা শিগগিরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বসে বাসের ট্রিপ ও বাস বাড়ানোর দাবি জানাবো।’

দুর্ঘটনার বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক ড. মাইনুল হক। তিনি অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার বিষয়টি সম্পর্কে জানি না। কয়েকদিন ধরে আমি নিজেই বাসে চলাচল করছি ও বিষয়গুলো দেখভাল করছি। বাসে ভিড় একটু হবেই, তবে বাসের সংকট নেই। শিক্ষার্থীরা ভালোভাবেই চলাচল করছে। আর খুবই দরকার পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা অনুযায়ী বাসের ব্যবস্থা করা হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সীমা বাড়ার সঙ্গে বাসের ট্রিপ কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সঙ্গে দুপুরে তিনটি বাসের ট্রিপ ছিল। বর্তমানে বিকেলে ক্লাস থাকায় সব শিক্ষার্থী চলে যাচ্ছে না, তাই দুপুরে শুধু একটা ট্রিপ রাখা হয়েছে। আর এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি শুধু বাস্তবায়ন করছি।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. আনন্দ কুমার সাহা অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘এ রকম দুর্ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্য দুঃখজনক। অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের চালকরা বেপরোয়াভাবে বাস চালায়, শিক্ষার্থীরা উঠতেই পারেনি অথচ বাস ছেড়ে দিয়েছে- এমন বিষয়গুলি বাসে ভিড়ের থেকেও ভয়ানক।’ পরিবহন দফতরের প্রশাসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বসে বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করা হবে বলে তিনি জানান।

অমৃতবাজার/শিহাবুল/রেজওয়ান

Loading...