ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭ | ৫ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

খরচ বেশি, সুবিধা কম: আবাসিক ভবন ছাড়ছেন রাবি শিক্ষকরা


শিহাবুল ইসলাম, রাবি

প্রকাশিত: ১০:৪৯ এএম, ২১ মে ২০১৭, রোববার | আপডেট: ০১:১২ পিএম, ২১ মে ২০১৭, রোববার
খরচ বেশি, সুবিধা কম: আবাসিক ভবন ছাড়ছেন রাবি শিক্ষকরা

যখন-তখন দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তার, চারদিকে ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি হওয়ায় মশা-মাছির উৎপাত, সেই সঙ্গে বিদুৎ ও পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার বেহাল দশা চরম আকার ধারণ করেছে।

এমনই নানা সমস্যায় ভুগছে ’৬০ এর দশকে নির্মিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষকদের ভবনগুলো। খরচের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত থাকায় আবাসিক ভবন ছেড়ে দিচ্ছেন শিক্ষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের থাকার জন্য ক্যাম্পাসেই ’৬০-এর দশকে আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এখানে দোতলা, তিনতলা ও চারতলা মিলিয়ে প্রায় ৮৮টি ভবন আছে। এর মধ্যে আছে উপাচার্য ও উপউপাচার্যের ভবন।

এ, বি ও সি এই তিন ক্যাটাগরির আবাসিক ভবনগুলোর ৩১৯টি বাসায় শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পরিবার থাকার ব্যবস্থা আছে। এখানে সরকার নির্ধারিত বাড়ি ভাড়া থেকে বাড়ি ভাড়া কর্তন হিসেবে ২৫৯টি ও নির্ধারিত বাড়ি ভাড়া হিসেবে ৬০টি বাসা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় দুই হাজার। সে হিসেবে মোট শিক্ষক-কর্মকর্তার প্রতি সাতজনের জন্য বাসা বরাদ্দ রয়েছে একটি।

এছাড়া সাধারণ ও সহায়ক কর্মচারীদের জন্য একইভাবে বেতন থেকে বাড়ি ভাড়া কর্তন হিসেবে ৮৮টি ও নির্ধারিত বাড়ি ভাড়া হিসেবে ৫০টিসহ মোট ১৩৮টি পরিবারের বসবাসের ব্যবস্থা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি গেজেট অনুযায়ী বেতন স্কেলের ৮ হাজার ২৫০ থেকে ৯ হাজার ৭শ টাকা বেতনধারীদের ৫৫ শতাংশ, ৯ হাজার ৭০১ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, ১৬ হাজার এক টাকা থেকে ৩৫ হাজার ৫শ টাকা বেতনধারীদের ৪৫ শতাংশ এবং ৩৫ হাজার ৫০১ টাকা থেকে তদূর্ধ্ব বেতনধারীদের বেতনের ৪০ শতাংশ এ চারটি ক্যাটাগরিতে বাসা ভাড়া বাবদ পেয়ে থাকেন শিক্ষক-কর্মকর্তারা। এ হিসেবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক বাসায় থাকা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বাসা বাড়া কর্তন করা হয়।  

সূত্রটি আরো জানায়, গত তিন মাসে প্রায় ৪০ শিক্ষক আবাসিক ভবন থেকে চলে গেছেন। বর্তমানে খালি পড়ে আছে ৫৩টি বাসা। এদিকে ছেড়ে যাওয়া বাসাগুলোয় শিক্ষকদের আবাসিকতা গ্রহণের জন্য নোটিশ দেয়া হলেও তাতে সাড়া মিলছে না।



আবাসিক শিক্ষকদের অভিযোগ, ‘৬০-এর দশকে যেভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেভাবেই রয়ে গেছে আবাসিক ভবনগুলো। এর মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে পেইন্ট ও ফিটিংস। বাইরে থেকে দেখে ভালো মনে হলেও ভবনগুলো পুরনো হওয়ায় অনেক সময় ছাদ থেকে বালি ও পলেস্তার খসে পড়ে। এছাড়া টয়লেটের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর দুর্গন্ধের কারণে বসবাস করা কষ্টকর। বিদ্যুতের লাইনগুলোও নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। আশেপাশে থাকা পানির নালাগুলোতে জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয় মশা-মাছিসহ ক্ষতিকর পোকা-মাকড়। এভাবে বসবাসে স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হচ্ছে।

এছাড়া খরচের তুলনায় মানসম্মত পরিবেশ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বারবার বলা হলেও সাড়া দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাই বাধ্য হয়ে বাসা ছাড়তে হচ্ছে বলে দাবি শিক্ষকদের।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৯-১৩ মেয়াদে সোবহান স্যার থাকাকালীন আবসিক বাসার নির্ধারিত ভাড়া করার দাবিতে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। এরপর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অধ্যাপক মিজানউদ্দিন উপাচার্য হওয়ার পরও বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি। এ ঘটনায় হতাশা ব্যক্ত করেন শিক্ষকরা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রকীব আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক বাসা ছেড়ে বর্তমানে বাইরে থাকেন। তিনি অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আবাসিক ভবনগুলো আছে সেগুলো খুবই নিন্মমানের। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খরচ বাড়লেও বাসায় কোন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই। রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে বিদ্যুতের লাইনগুলো পর্যন্ত খুবই নড়বড়ে। তারপর আবার খরচও অত্যাধিক। তাই মূলত শিক্ষকরা ভবনের ফ্ল্যাটগুলো ছেড়ে বাইরে ভাড়া বাড়িতে চলে যাচ্ছেন।’

আবাসিক বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস। ওই ভবনে আটটি বাসা থাকলেও তিনি বাদে বাকি সাতটি বাসাই খালি পড়ে আছে। খরচের সঙ্গে সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত থাকলে এভাবে খালি পড়ে থাকতো না বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘পুরাতন হওয়ায় দেয়াল ও ছাদ থেকে পলেস্তার খসে পড়ে, আশেপাশে ঝোপ-ঝাড়, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার বেহাল দশা, মশা-মাছির উৎপাতসহ নানা ধরনের অসুবিধার মধ্যে এখানে বসবাস করতে হয়। এসব অব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকতেও যে পরিমাণ খরচ হয়, তার অর্ধেক খরচে রাজশাহীর বিলাসবহুল বাসায় থাকা যাবে। অতিদ্রুত বাসাগুলো সংস্কার করার দাবি করেন তিনি।’



নির্ধারিত ভাড়া দাবির আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান খান অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘সদ্য সাবেক উপাচার্য আমাদের আন্দোলনের অন্যতম একজন ছিলেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তাকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি উপাচার্য হওয়ার পর বিষয়টি আর আমলে নেন নি। উল্টো তিনি বলেছেন, বাইরে কম খরচে থাকা গেলে আপনি এখানে থাকছেন কেন। এটা কোন অভিভাবকসুলভ আচরণ হতে পারে না।’ এটাই ‘চেয়ারের চরিত্র’ বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।’

প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের স্টিয়ারিং কমিটির নির্বাচিত এ সদস্য আরো জানান, অনেক বাসা দীর্ঘদিন থেকে পড়ে রয়েছে। বাসাগুলো ব্যবহার না করায় একদিকে যেমন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়েরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিভাগীয় শহরের বাসাভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারিত ভাড়া করা প্রয়োজন। নতুন উপাচার্য দ্রুত বিষয়টি সমাধানে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন এটাই এখন আমাদের প্রত্যাশা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা বরাদ্দ কমিটির আহ্বায়ক এবং জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম ফারুকী অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘বাসাগুলোতে থাকতে আমরা শিক্ষকদের শুধু আমন্ত্রণ জানায়। এর বেশি কিছু আমাদেরও করার থাকে না। তবুও বাসাগুলোয় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে বার বার বলে আসছি। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকেও নির্ধারিত একটা ভাড়া করার দাবি রয়েছে। এসব বিষয়ে এখন আমাদের নতুন প্রশাসনের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে রাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘শিক্ষকদের বাসাগুলোর মান উন্নয়ন ও নির্ধারিত ভাড়ার দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন চলছে। আমরা নতুন দায়িত্ব নিয়ে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। আশা করছি খুব শ্রীঘই বিষয়টির সমাধান হবে।’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মশিউর রহমান অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘খালি পড়ে থাকা ৫৩টি বাসায় শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওঠার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। কোন শিক্ষক বরাদ্দকৃত বাসায় ওঠার আগে আমরা বাসাটি ঠিকঠাক করে দেই। এছাড়া শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত ভাড়া করার অনুমতির বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।’ বাসাগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান অমৃতবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘কয়েকদিন হলো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি। পর্যায়ক্রমে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।’

অমৃতবাজার/শিহাবুল/ইব্রাহিম

Loading...