ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ঈদে ব্যাংকের এটিএম কার্ড কতটা নিরাপদ?


অমৃতবাজার রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ০৪ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার
ঈদে ব্যাংকের এটিএম কার্ড কতটা নিরাপদ?

ঈদে বেশ কয়েকদিন ব্যাংক বন্ধ থাকে। তাই এ সময় টাকা তোলা বা লেনদেনের একমাত্র ভরসা ব্যাংকের ক্রেডিট কিংবা ডেবিট কার্ড। তবে সম্প্রতিক সময়ে এটিএম বুথে জালিয়াতির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অনলাইনে মেয়েদের পোশাকের ব্যবসা করেন কাকলী তানভীর। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘জালিয়াতির নিত্য নতুন যেসব পন্থার কথা শুনি মাঝে মধ্যে, তাতে করে এটিএম বুথে ঢুকলে ভয় লাগে।’

তিনি জানান, একবার কার্ড নিয়ে সমস্যা হলে বা কেউ জালিয়াতি করে টাকা সরালে তার প্রতিকার নিয়েই উদ্বেগ লাগে। আর ঈদের সময় বা এ ধরনের লম্বা ছুটিতে তো পুরোপুরি কার্ড আর এটিএম বুথ নির্ভর থাকি। তাই ভয় লাগে আরও বেশি।’

গ্রাহকদের ভয় কাটাতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, ‘টাকা নিয়ে গ্রাহকের উদ্বেগের কিছু নেই। ব্যাংক বা বুথ থেকে টাকা গেলে সেটি গ্রাহক ফেরত পাবেই। গ্রাহক সবসময় সুরক্ষিত। আইন অনুযায়ী তার টাকা আমি তাকে ফেরত দিতে বাধ্য।’

তিনি বলেন, এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসে অপরাধীরা ইন্টারনেট আর কম্পিউটারের মাধ্যমে চুরি করছে। যত বেশি আধুনিক প্রযুক্তি আসছে অপরাধীরাও তেমন পন্থা বের করার চেষ্টা করছে।

আনিস এ খান বলেন, ‘এ কারণেই আমাদের আসলে এক পা এগিয়ে থাকতে হবে। ফায়ারওয়াল, সফটওয়্যার এসব বিষয়ে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছি। আগে ব্যাংকে শুধু আইটি বিভাগ ছিলো এখন আইটি সিকিউরিটি বিভাগ হয়েছে এবং তার ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে।’

চ্যালেঞ্জ যেমন আসছে তেমনি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোও সক্ষমতা অর্জন করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আবার দেশে তুলনামূলক নতুন কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি- এনআরবি ব্যাংকের চীফ অপারেটিং অফিসার ইমরান আহমেদ বলছেন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বুথ ও কার্ডের বিপরীতে লেনদেনকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের আওতায় এনেছেন তারা।

কার্ড নিয়ে তিনি বলেন, ‘কার্ড নিয়ে আমরা বেশি উদ্বিগ্ন থাকি। কারণ দেখা গেছে কার্ড হোল্ডার ঢাকায় আর লেনদেন হচ্ছে ভেনিজুয়েলায়। বা ই-কমার্সে পেমেন্টের ক্ষেত্রে জালিয়াতির সুযোগ থাকে। আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্র এগুলো করে। এজন্য টেকনিক্যাল যা করার দরকার সেটি করা হয়েছে।’

আহমেদ বলেন, জালিয়াতরা নিত্য নতুন পন্থা বের করছে তাই আমরাও সিকিউরিটি ভেন্ডরদের সাথে একযোগে কাজ করছি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার ভিত্তিক, বুথ ও গ্রাহকদের দেওয়া কার্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।

এজন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস ও বুথে জ্যামারের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা বুথ ও লেনদেনগুলো সেন্টার সিকিউরিটি সিস্টেম ও কল সেন্টার থেকে মনিটর করা হচ্ছে।

নতুন এই ব্যাংকটির নিজস্ব এটিএম বুথ ৪৩টি হলেও ব্যাংকটির গ্রাহকরা দেশের বিদ্যমান সব ব্যাংকের যে হাজার হাজার এটিএম বুথ আছে সেখানে এনআরবির কার্ড দিয়েই টাকা উত্তোলন করতে পারেন।

২০১৬ সালে বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চারটি এটিএম বুথে গ্রাহকের কার্ডের তথ্য-উপাত্ত চুরি করে এটিএম থেকে অর্থ তোলার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলো।

তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে এসব তথ্য চুরি করা হয়েছে। ঐ সময়ের মধ্যে ঐ চারটি বুথে ১২০০ কার্ডে লেনদেন হয়েছে।

তবে তথ্য চুরি ও কার্ড ক্লোন হয়েছে ৩৬ টির মতো কার্ডে এবং এভাবে প্রায় ২০ লাখের মতো অর্থ চুরির ঘটনা ঘটেছিলো।

আর ওই ঘটনাতেও উঠে এসেছিলো কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের নাম। এর আগে বনানীর একটি সুপার শপে ডেবিট কার্ডে গ্রাহকরা বিল দেওয়ার পর চারটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি হয়ে টাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছিলো।

এসব কারণেই কার্ড ও এটিএম বুথ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও।

কিন্তু এবার ঘটেছে আরও অভিনব ঘটনা। গত শুক্রবার রাতে ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ তুলে নিলেও তার রেকর্ড পাওয়া যায়নি ব্যাংকের সার্ভারে কিংবা কোনো গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা যায়নি।

অর্থাৎ টাকাটা সরাসরি এটিএম মেশিন থেকে বের করে নিয়েছে এবং কর্মকর্তারা বলছেন এখানে এক ধরনের কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলোর মেশিনে দিয়ে সরাসরি অর্থ বের করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ আটক করেছে ইউক্রেনের পাঁচ নাগরিককে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপ কমিশনার শহিদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান যে এই ইউক্রেনিয়ান নাগরিকরা বৈধভাবেই বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন।

রহমান জানান, ‘সাতদিনের ভিসা নিয়ে ৩০ মে তারা বাংলাদেশে আসে। ৬ জুন এখান থেকে ভারত যাওয়ার কথা ছিল তাদের।’

রাজধানীর পান্থপথের একটি হোটেলে তারা অবস্থান করছিলেন। ঠিক কোন পদ্ধতিতে তারা এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করলেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি পুলিশ।

‘তারা কীভাবে এই কাজ করলো সেটি বিশ্লেষণ করতে এরই মধ্যে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়েছি আমরা। একইসাথে ঐ নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদও চলবে।’

রহমান জানান, গ্রেফতার হওয়া ৬ জনের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তবে এখনো তাদের পরিচয় সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারেনি পুলিশ।

‘আটককৃতরা তাদের নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে বললেও সেগুলো এখনো যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে তাদের পরিচয় জানতে চাইব।’

বাংলাদেশে ইউক্রেনের দূতাবাস না থাকায় এই পদ্ধতি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

রহমান বলেন এরকম ঘটনা ঘটতে পারে, পুলিশ আগে থেকেই সেই আশঙ্কা করছিল এবং তারা এরকম প্রচেষ্টা থামাতে তৎপর ছিল।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বা বিআইবিএম এর গবেষণা প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়েছে দেশের ৫০ভাগ ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তায় নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়্যাল সফটওয়্যার স্থাপন করেছে। বাকীগুলোতে এখনো প্রক্রিয়াধীন।

গত এপ্রিলের শুরুতে এ প্রতিবেদনটি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়েছিলো।

ওই অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জনবল সংকটের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর এ বিষয়গুলোকে সর্বাত্মক গুরুত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে বলেই জানিয়েছিলেন তারা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

অমৃতবাজার/পিকে